অচ্ছুৎ কন্যা

“মিঠঠই! মিঠঠই!” রান্নাঘর থেকে বার দুয়েক হাঁক পাড়ল সুধা। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে সাতটা ছুঁই ছুঁই। দিবাকর এক্ষুনি মর্নিংওয়াক থেকে ফিরে যদি দেখে মেয়ে এখনো ওঠেনি, তুলকালাম করবে। অভিযোগের চালিসা পাঠে যত দোষ সব ঢালবে সুধার উপরেই। তর্জনী উঁচিয়ে রান্নাঘরের দোরে দাঁড়িয়ে বলবে, “টাইম ইজ মানি! ইয়ে সচ জো সমঝতি নেহি হ্যয়, উঁও কেয়া ডকটরি উকটরি করেগি? তখনি বলেছিলাম আমার ছোট বেলার লেঙ্গটিয়া বন্ধু বেরিলির ভবেশ গুপ্তার ছোটা ছেলের সাথে হাত পিলে কর দো! নেহি! বেটি ডক্টরি করেগি! অব ভুগতো!”

এই সাত সকালেই শাশু মা টিভি খুলে ভারিক্কি চালে গুরবানি শুনতে বসেছেন। কানটা যদিও ঘরের সাত সতেরোতে। হাতে জপের মালাও ঘুরছে, তবে উঁকি মারছেন রান্নাঘরের দিকে, দ্বিতীয় কাপ চায়ের জন্য। তবে এখন আর চা বানাবে না সুধা। দিবাকর এলে একেবারে নাস্তার সাথে দেবে। 

গেট ঠেলে রামভরসা ঢুকল। হাতে মাদার ডেয়ারির দুধের প্যাকেট। বরাবর ভারি নাস্তা করে দপ্তরে বেরনো দিবাকরের অভ্যেস। “রামভরসা, আটা গুন্দকে রাখো আউর আলু উবালো। পরাঠা বনেগি।”

স্টোভে চায়ের জল চাপিয়ে আর দেরী করে না সুধা, তড়বড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গিয়ে মেয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে জিভ কাটে। “অরি, মিঠঠী তো কাল রাত সে গুদাম মে সোই হ্যয়!” 

তিনতলার ছাতে তখন ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ। বছর দশেক আগেও দিল্লীতে বসন্তের আমেজ পাওয়া যেত। সকাল সন্ধ্যে ভারি মিষ্টি একটা হাওয়া বইত। কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গুলমোহর গাছের ঝরা ফুলে পথঘাট লাল হলুদ বেগনি রঙে নক্সাকাটা হয়ে থাকত। কোকিলগুলো গাছের পাতার আড়াল থেকে কু কু ডেকে মন মাতিয়ে দিত। আর আজ? যেদিকে চোখ যায় শুধু তালঢ্যাঙ্গা হাইরাইজ! আকাশের নীলই চোখে পড়ে না, তো সবুজ কোন ছাড়! 

ছাতের গুদম ঘরটায় মাসকাবারি আনাজপাতি চাল ডাল ঘি তেল থাকে। তাছাড়া এ বাড়ীর মেয়ে-বৌদের মাসে চার পাঁচ দিন এ ঘরেই কাটে। দরজা ঠেলে সুধা দেখে মেয়ে ঘুমিয়ে কাদা। ভোর ভোর নেয়ে নিয়েছে সুধা। শাশুড়ির পূজার জোগান করতে হয়, তাই মেয়েকে না ছুঁয়েই চেঁচায় সুধা, “অরি ও মিঠঠী! জলদি উঠ! চাটাই উঠা! ঝাড়ু লাগা, পোঁছা দে!”

মেয়ে পাশ ফিরে বলে, “আম্মা প্লীজ, সুবেহ সুবেহ শুরু মত করো!”  

তবে মেয়ে চোখ পিটপিট করছে দেখে সুধা আর দাঁড়ায় না। ছাতে নেমে গলা তোলে, “পাপা ওয়াক করকে আতেই হোঙ্গে, তুরন্ত তৈয়ার হো যাও!”  

মা’র গলা ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডারের মতন একটানা বেজে ছাতের ওপারে মিলিয়ে গেলে কিছুক্ষণ ঝুম মেরে পড়ে রইল মিঠঠী। একটা হাঁচি প্রাণপণ আটকাবার চেষ্টায় মগ্ন থাকল। এখন বেমক্কা একটা হাঁচি মানে শরীরে হুন্দ্রুর ফলস! আর ওঠা মানেই তো কতগুলো বিরক্তিকর কাজ যা আম্মা আর দাদি ট্র্যাডিশনের নাম করে ঘাড়ে ধরে করিয়ে যাচ্ছে বছর বছর। সমস্ত মনটা কড়ওয়া পানির মতন  বিস্বাদ হয়ে গেল মিঠঠীর। 

ছাতের কলে মুখ ধুয়ে মেঝে থেকে চাটাই গুটিয়ে, ঘর ঝাঁট দিতে দিতে গজগজ করে তার মন। “এক ম্যায় হি অপবিত্র হুঁ না! নিচে সব ভরে পড়ে হ্যাঁয় পবিত্র ইনসান! অব যাঁহা যাঁহা মেরি প্যার পড়েগা সব অপবিত্র হো জায়েগা!”

রাতের জামাকাপড় কেচে, জিন্সে ঠ্যাং আর টি শার্ট খানা গলিয়ে ব্যাগপ্যাক ঘাড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শুনল, দাদি বলছে “মিঠঠী  গুদাম মে গয়ি ক্যা?” 

শুনেই মেজাজটা চড়াং বাড়ল মিঠঠীর। সে যেন একটা আলুর বস্তা!  পাপা চায়ের কাপ হাতে বস্তাপচা ডায়লগে বলছে,  “অভি ভি রাজি হ্যাঁয় মেরা বেরিলি কা লেঙ্গটিয়া! কহো তো শাদি কী বাত চলা দুঁ? পঢ়ালিখা করে অতো কী হবে? সেই তো হাণ্ডি ডেকচি ধরতেই হবে!” 

“এক্সকিউস মি!” মিঠঠী বাপের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বললে — “ফর ইয়োর কাইণ্ড ইনফরমেশান আমি ধরব কাঁইচি এণ্ড  ছুরি! বিকস আই এম গন্না বি আ সার্জেন ইন নিয়ার ফিউচার!” 

ধপাস করে ব্যাগপ্যাকটা সোফায় ফেলেছে কি ফেলেনি, দাদি আঁতকে উঠে বললে, “মত বৈঠ! মত বৈঠ!” 

লাফিয়ে ওঠে মিঠঠী। “কী হল?”

দাদি চোখ গোল করে বললে, “সোফা কাভার সাফেদ হ্যয় না!”  

তুম্বোমুখে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সুধা ট্রাফিক পুলিশের মত হাত দেখিয়ে থামায়, “ওহি পে রুখ যা! রসুই কি অন্দর মত আনা।” 

“হাঁ, হাঁ, মুঝে মালুম হ্যয়! অন্দর জানে কা কোই শখ ভি নেহি!” স্টিলের ঝকঝকে থালায় আলু পরোটা, সুখা সবজি আর দই। মিঠঠী হাত বাড়ায়। 

সুধা বলে, “আগে দাদি আর পাপাকে দিই দাঁড়া!”

“আমাকে দাও, আমি দিয়ে দিই!” দাদি গলা তুলে বলে, “অরি ও ছোরি, থালি কো ছুনা নেহি! সব খরাব হো জায়েগা!” 

মিঠঠী বাঁকা হেসে বলে, “কিউঁ? মেরি হাথেলি সে উঁ উঁ উঁ করকে মিথেন গ্যাস নিকল রাহি হ্যয় ক্যা?”  

মেয়েকে পাশ কাটিয়ে থালা দুটো নিয়ে দিবাকর আর শাশুড়িকে দেয় সুধা। রান্নাঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে মিঠঠী বলে, “অচ্ছ্যুৎ কন্যা কে লিয়ে ভি কুছ খানা দে দিজিয়ে!” তারপর গুনগুন গান ধরে — “ ম্যায় বনকে চিড়িয়া বনকে বন বন বলুঁরে, ম্যায় ডাল ডাল উড জাউঁ, নেহি পকড়াই মে আউঁ…”

আড়চোখে দেখল বাবার মুখটা থম মেরে গেছে। পাত্তা দিল না মিঠঠী। সুধা একটা এনামেলের থালায় করে খাবার বেড়ে দিল মেয়েকে। চাপা গলায় বলল, “অব নৌটঙ্কি বন্ধ কর!” 

 “মা, আচার!” শুনে দাদি অমনি বলে উঠল, “তু পগলা গয়ি ক্যা? আচার তো বিলকুল নেহি। ঔরত কো ইস সময় দুধ, মাসালা কুছ ভি নেহি ছুনা চাহিয়ে, সমঝি!” 

“ধুত্তোর! নিকুচি করেছে!” মনে মনে গজরিয়ে দাদির দিকে কটকট করে তাকায় মিঠঠী। নিজে আচারের কাঁচা আম কেমন আমতেল দিয়ে মেখে খাচ্ছে দেখো!এজন্যই বলে মেয়েরাই মেয়েদের চরম শত্তুর! দাদি তো নয়, টপ টু বটম চলতি ফিরতি রুলবুক একখানা। নাহানা, খানা, সোনা সবেতেই শুধু ঝিকঝিক! হর মহিনা এই সময় লাইফের সব ফ্রিডম গায়েব! খালি “ইয়ে মত কর” আর “ওহ কিউঁ নেহি কিয়া” এই শোন!

“মিঠী অপনা বর্তন খুদ ধো লেনা,” মা বলল। এ আর নতুন কথা কি!

নিজের এঁটো বাসন বাইরের কলে নিয়ে ধুতে ধুতে ভাবে মিঠঠী, মাসের এই চার পাঁচ দিন, বাড়ীতে কাজ করেন যে রামুকাকা, তার থেকেও খারাপ ব্যবহার পায় যেন সে। অথচ তার দোষটা কী? প্রতি মাসের একটা নেহাতি কমন শারীরবৃত্তীয় প্রসেসের ভিতর দিয়ে যাওয়া, এই তো?  

দাদির কথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল, আম্মাও এই সময় মিঠঠীর প্রতি সব ভালোবাসা ভুলে যায়! আম্মা কি জানে না, এই সময় কতো কষ্ট যন্ত্রণা হয় শরীরে, পেটের ব্যথায় এক এক সময় মনে হয় ওই ডাইনিং টেবিলের নিচে ছটা চেয়ারের পায়ার ফাঁকে নিজেকে ফিক্স করে চুপচাপ পড়ে থাকে ঠাণ্ডা মেঝেতে।পায়ার মাঝে আটকা থাকলে দিব্যি নট নড়ন চরণ হয়ে সবার চোখের আড়ালে শুয়ে থাকা যাবে! এই সময় একটা ভুল চলা, বসা, হাঁচি কিম্বা কাশি মানে ‘আ বৈল মুঝে মার’ অবস্থা। আর সেখানে এদের দেখো, খাটিয়ে খাটিয়ে ভুত ভাগাবার দশা করে রাখে! ছোঃ! এর নাম পরম্পরা! সংস্কার! 

পাপাজির কথা তো ছেড়েই দিলাম। আমার কোন ব্যাপারে কবে মাথা ঘামিয়েছে? ব্যাগপ্যাক কাঁধে নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরি হয় মিঠঠী। আজ আবার শুরুতেই অ্যানাটমি, দেরী হলে প্রফেসর বিজয় কিশোর নন্দ ভারি মন্দ ভাষায় গাল দেবেন! পটপড়গঞ্জ মাদার ডেয়ারি থেকে মেট্রো নিলে ঘণ্টা খানেক মত লাগবে সফদরগঞ্জ মেডিকেল ক্যাম্পাসে পৌঁছতে। অফিস টাইমে যা মারকাটারি ভিড়, বাপস! কিন্তু এখন তো মিঠঠী ষ্টেশনে যাবে না। রিখিয়া অপেক্ষা করছে ওর জন্য।

“আম্মা, আজ দের হো জায়েগি আনে মেঁ,” বলে বারান্দায় নেমেই দেখে দাদি তুলসী গাছের কাছে বেতের চেয়ার পেতে মালা হাতে এসে বসেছে। মালাটা অবিশ্যি এহ বাহ্য, সামনের রাস্তা দিয়ে যত সব্জিওলা, ফলওলা, শীল কাটাও,কাজের বৌরা যাবে, সবার সাথে আমড়াগাছি করবে। মিঠঠীকে  দুদ্দাড় করে বেরতে দেখে গলা তোলে দাদি, “মিঠঠী, আজ ভুল কর ভি গণেশজী কো মাথা নেহি ঠেকনা!” তারপর  সামনে সব্জি নিচ্ছিল ঠেলা থেকে কক্কড় চাচি, তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, “এক হামারি জমানা থা, হাম পুরে পুরে দিন রেস্ট করতে থে, অব জমানেকো দেখো, চল পড়ি কালেজ মে উছলকুদ করনে!” 

পাশের বাড়ীর গণেশ ওদের গাড়ি ধুচ্ছিল। মিঠঠী পরিষ্কার দেখল, গণেশ মুখ টিপে হাসল। কোনও মানে হয়, এইভাবে ওর পিরিয়ডসের অ্যাডভারটিসমেণ্ট করার! 

কাঠের সিঁড়িতে দুদ্দাড় শব্দ শুনেই রিখিয়া বুঝল ডালমে কুছ কালা হ্যয়! ঝড়ের মতন ঘরে ঢুকে মিঠঠী বলল, “উহহ! আনবেয়ারেবল!” 

রিখিয়া ভালোই চেনে বন্ধুকে। সেই কেজি ক্লাস থেকে একসাথে আছে। “ক্যা হুয়া?” জিজ্ঞেস করতে মিঠঠী “ফির সে অপবিত্র হো  গই হূঁ” বলে গনগনে মুখে বাথরুমে ঢুকে গেলো।

যা ভেবেছিল তাই! মীঠঠীদের বাড়ীতে এই অদ্ভুত এক নিয়ম। প্রতি মাসে বাড়ীর মেয়ে-বৌরা রজঃস্বলা হলে তাদের সাথে নিয়মের নামে চলে যত রাজ্যের অনিয়ম। রিখিয়া তাই পারতপক্ষে ওই সময় মীঠঠীদের বাড়ীর ধারে কাছে যায় না। মিঠঠীর দাদির ভারি গর্ব, তিনি নাকি মুখ দেখে বলে দিতে পারেন যে মেয়েরা সাফ সূতর আছে কি না! একবার রিখিয়াকে ধরে বলেছিলেন, “ম্যায় ভি ছুপা রুস্তম হুঁ। য়হ চীজ মুঝসে না ছুপানা। শকল সে বিলকুল চোর লগতি হো, যব ছুপাতি হো।”  

বাথরুম থেকে অবিশ্যি স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বেরল যখন, মিঠঠীর মুখে চাপা স্বস্তি দেখল রিখিয়া। ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে বলল, “হাঁ করে বসে আছিস কি! আজ ফার্স্টেই ‘মন্দজি’-র ক্লাস!” দুই বন্ধু রাস্তায় নেমে হেসে গড়ায়। নন্দ স্যারের গালিগালাজ শুনে ভালোই নিক নেম রেখেছে সিনিয়ররা! 

মেট্রোতে বসে মিঠঠীকে ওষুধ খেতে দেখে রিখিয়া প্রশ্ন চোখে তাকায়। মিঠঠী গোমড়া মুখে বলে, “ইয়ার গায়ে হাত-পায়ে যা ব্যাথা, আর বলিস না! আচ্ছা, লোকের তবিয়ত ডাউঁন হলে তারা কোথায় শোয়ে? নিজেদের বিস্ত্রায় তো? আর আমাকে শুতে হয় ছাতের কাল কোঠরি গুদামে, তাও আবার ফুটি ফাটা মেঝেতে, চাটাই বিছিয়ে! রামুকাকা পর্যন্ত সারাদিনের পরে ওর বিছানায় শুতে পারে, পাশের বাড়ী বিট্টূদের কুকুরটা পর্যন্ত ওর মালিকের বিছানায় শুতে পারে, শুধু পারি না আমি।” 

রিখিয়া বন্ধুর দিকে সমব্যথীর চোখে তাকায়। “ট্রু ইয়ার, আই ক্যান আণ্ডারস্ট্যান্ড!” 

ফুঁসে ওঠে মিঠঠী। “নো, ইউ ক্যান্ট! বিকস আই অ্যাম দ্য ওয়ান গোয়িং থ্রু দিস রাবিশ রীতি রিওয়াজ!” 

আশেপাশের লোক তাকাচ্ছে বুঝে গলা নামায় মিঠঠী। “চল, শোবার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, ওকে? এখন তো ঐসে ভি গরমি  হ্যয়। মেঝেতে শোয়া, বাহারওয়ালি ট্যাঙ্কি পে নাহানা কোই বড়ী বাত নেহি। পর, ডিসেম্বর মে দিল্লীকা ঠণ্ডমে আম্মি বাহার নাহানে কে লিয়ে বোলেগি। কিউঁ ভাই? বাথরুমমে কিউঁ নেহি নাহা সকতে? জাস্ট বিকস আই অ্যাম অন মাই পিরিয়ডস? দাদি বীচ মে আকে টাং লড়ায়েগি। আরি বেটা, হামারি জমানেমে লোগ পরম্পরা য়হ রহি হ্যয় কি, ঔরত ইস সময় আম স্থান পে নেহি নাহাতে!”  

শুনে রিখিয়া নড়েচড়ে বসে বলল, “ইন্টারেস্টিং!” মেট্রোতেও প্রায় পঞ্চাশ মিনিট লাগে তাদের পৌঁছতে। বন্ধুকে মনের ভার হাল্কা করার সুযোগ দেয় রিখিয়া। ওহ গড, এমন মার্কামারা একখানা দাদি থাকলে সে নিজে যে কী করত কে জানে!

মিঠঠী বললে, “ইন্টারেস্টিং? মাই ফুট! ডিসগাসটিং! এদের মোটা বুদ্ধিকে কে বোঝাবে যে পুরানে জমানে পে বাথরুম নাম কা কোই চীজ হোতা হী নেহি থা! লোকেরা খাল বিল নদী নালাতেই চান করত। অব খুল্লা নদী কা পানি জান বুঝকর কোই খারাব করেগি ক্যা? তাই মাসের ওই চার পাঁচ দিন মেয়েরা চানই করতো না! এভাবেই তারা বেসিক হাইজিন রক্ষা করত। কিন্তু না, আমরা তো ট্র্যাডিশনের নামে অন্ধ। স্বার্থপরের মতন নিজেদেরই মেয়ে-বৌদের হাইজিনের নামে লাইফের সুখ শান্তির ঐসি কি তয়সি না করলে আমাদের চলবে কেন!” 

রিখিয়া গা ঝাড়া দিয়ে বলে, “অব ছোড় না ইয়ার!” 

ঠোঁট উলটে মিঠঠী বললে, “মুঝে ক্যা! আমার তো তোর বাড়ী আছে!”  

স্টেশন থেকে বেরিয়ে পথে নেমেই মিঠঠীরা বুঝল চলতি মাসে দিল্লী আগুনে বেগুনপোড়া হবে। আকাশটা এখনই কেমন ধু ধু করছে । দুরে উড়ছে একটা গ্যাস বেলুন। সেদিকে তাকিয়ে উদাস সুরে মিঠঠী বললে, “বাড়ীতে তো ওই রকম হাত পয়ের গুটিয়ে বেলুনের মত ভেসে থাকতে পারলেই বাঁচোয়া। রাত দিন ঝিকঝিক —  এটা ছুঁয়ো না আর ওটা ছুঁয়ো না, এখানে বোসো না, ওখানে ঢুকো না, খাবার থালিটা পর্যন্ত তোবড়ান এনামেলের। আম্মি, দাদির ভয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে খাবার পরোসে আমাকে। ইয়ে ভি কোই জিন্দেগী হ্যয়?” 

রিখিয়া এবার না বলে পারে না, “তেরী পাপা ভি তো কুছ নেহি বোলতে!”

শুনে মুখ বেঁকায় মিঠঠী। “ওহ কিউঁ কুছ বোলেঙ্গে?” নিজের বাবাকে কোনও দিন চিনেই উঠতে পারল না মিঠঠী। ওদের বাড়ীর কাছেই লাক্সমী নগরে চাচা থাকেন। প্রায় প্রতি শনি রোববার আসে ওরা। চাচা চাচি আর দুই চাচেরা ভাই রাহুল মেহুল। ছোট থেকে দেখেছে মিঠঠী, পাপার কাছে ওই দুই ভাইয়ের সব বায়না আবদার সর আঁখো পর! ওরা এলেই বাবার মুখ চোখ কেমন আলো আলো হয়ে যায়, বাবা বেশী বেশী হাসে, বেশী কথা বলে, মুখে গল্প কাহানীর খই ফোটে। গলিতে গিয়ে ওরা ক্রিকেট খেলে, ছাতে পতঙ্গ ওড়ায়। বিশ্বকর্মা পূজার আগে সারারাত ধরে ঘুড়ি বানায়, কাঁচের গুঁড়ো মাখিয়ে স্পেশাল মাঞ্জা বানায়। নিজের শৈশব, কৈশোরে কোথাও নিজের বাবাকে খুঁজে পায় নি মিঠঠী। এমনও হয়েছে, মিঠঠীর স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে না গিয়ে পাপা, চাচা যেতে পারবে না বলে, রাহুল ভাইয়ার প্যারেণ্ট টিচার মিটিঙে চলে গেছে! 

পুরনো দিনের কথা মনে পড়লে মনটা বড্ড কড়ওয়া হয়ে যায় মিঠঠীর। ছেলেবেলা থেকেই মিঠঠী বুঝে গেছিল যে সে মেয়ে বলেই পাপা তাকে ইগনোর করে। পাপার মনোযোগ পাওয়ার জন্য এক সময় সে ফ্রক পরতে চাইত না। রান্নাবাটি খেলা সব ফেলে দিয়েছিল। ছেলেদের মত চুল রাখা, হাবভাব কথাবার্তা নকল করে বলতে শিখেছিল। তার জন্য বুআ, দাদি, এমন কি আম্মার কাছেও কম কান মলা, চড়চাপাটি খায়নি। 

আর এখন তো বাবার উদাসী ভাব, কথায় কথায় মিঠঠীকে পরিবারের বোঝা, লায়াবিলিটি ভাবা, এসব গা সওয়া হয়ে গেছে।  

“মিট্টহী! মীঠী!” ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে ওরা দেখল স্কুটারে বসে আছে এক মোটা ভদ্রলোক। ভুঁড়ির চাপে পেটের বোতাম খোলা। হেলমেট খোলার চেষ্টা করছেন প্রাণপণে, কিন্তু সেটা ওনার চিবুক চিপে এমন বসেছে, খোলার নামটি নেই। অগত্যা উনি ওটার ভেতর থেকেই বললেন, “কালেজ যা রহী হো? শামকো মিলেঙ্গে! কুছ চাহিয়ে তো বোলো, লে করকে আয়েঙ্গে!” 

মিঠঠী কোনো কথার উত্তর না করে বন্ধুর হাতে হ্যাঁচকা টান মেরে কলেজের গেটে ঢুকে গেল। রিখিয়া আচমকা টান খেয়ে সামলাতে সামলাতে পেছন ফিরে দেখল ভদ্রলোক যা হোক করে হেলমেটটা খুলে হাতে ধরে ফেলফেল করে এদিকেই চেয়ে আছেন। “ আরে ইয়ার, য়েহ তো তেরা ফুফা হ্যয়!” 

“তো?” গম্ভীর চালে ক্লাসে ঢুকে যায় মিঠঠী। খানিক হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে, মাথা নেড়ে বন্ধুর পেছন পেছন ঢুকে যায় রিখিয়া। পিংপং বলের মত মুড সুয়িং তারও হয় বৈকি! আর মিঠঠীর দাদির ভাষায় যখন ‘অপবিত্র’ থাকে তখন তো আরও! 

সন্ধ্যে উতরে বাড়ী ফিরে মিঠঠী দেখে চাঁদের হাট বসে গেছে। ফুফা সকালে বলেছিল বটে, যে ওরা আসবে, এখন দেখল চাচারাও হাজির। চা সামোসা খাওয়া চলছে। পাপা আহ্লাদ করে মাকে বলছে — “রাহুল মেহুল কো আউর লাকে দো! জাওয়ান হ্যাঁয়, অভি নেহি তো কভি নেহি! হা হা হা!” নিজের রসিকতায় নিজেই ঘর ফাটাচ্ছে। 

মিঠঠীকে ঢুকতে দেখে ফুফি বলল, “হ্যাঁ রে, তুই নাকি আজ সকালে তোর ফুফাকে চিনতেই পারিসনি!”

“তাতে কী হয়েছে! তোমরা পারো বটে!” বলে মিঠঠীর কাছে এসে ফুফা হাত বাড়িয়ে এক গোছা গোলাপি গোলাপ ধরে বললে, “আগাম শুভ জন্মদিন মিঠী! কাল আমরা তোমার জন্মদিনে থাকতে পারব না, গুরুগ্রামে আমার গুরুদেবের কাছে যাব, তাই আজ…” 

ফুফার কথা কেটে মিঠঠী বলে উঠল, “আরে বাঃ! আমার জন্মদিনের চব্বিশ ঘণ্টা পহেলের পার্টি অ্যারেঞ্জ হয়ে গেল, আর আমি জানতেই পারলাম না!”

সুধা মেয়ের মেজাজের পারদ চড়া বুঝে বলল, “সেরকম কিছু নয়, এই সবাই মিলে একটু খাওয়া দাওয়া!” 

মিঠঠী কাঁধের ব্যাগপ্যাক মেঝেতে ধপাস করে ফেলে বলল, “হাঁ, হাঁ, জরুর, তাছাড়া আমি তো এবছরের জন্মদিনে  আবার অচ্ছুৎ কন্যা! ঘটা পটা করে জন্মদিন করার ঝামেলা অনেক! ছোঁড়াছুঁড়ি করে গিফট দেওয়া নেওয়া করে শেষে ঝাড়ু দিয়ে দিয়ে মরি আর কি!” 

“মিঠঠী!” বাজের গলায় ধমকে ওঠেন দিবাকর। ফুফার দেওয়া গোলাপি ফুলের তোড়াটা নিয়ে মিঠঠী বলল, “আর অন্য কোনও রং পেলেনা? ভাবলে আমি মেয়ে তো, তাই গোলাপিটাই আমার বেসিক পছন্দের কালার! যেমন লোকে ভাবে, ছেলে মানেই ব্লু! কিন্তু কান খোলকে শুন লিজিয়ে আপ লোগ, মেরি ফেভারিট কালার ভি ব্লু হ্যয়!”  

ভালো মানুষ ফুফা ঘরেলু শান্তি বজায় রাখতে বললেন,  “ঠিক হ্যয় ভাই, আইন্দা খেয়াল রখেঙ্গে! অব, নীল ফুল দিল্লীমে ঢুণ্ডনা আসান নেহি হ্যয়!” 

দাদি সারাদিন গাঁক গঁাক শব্দে টিভি খুলে রাখে। মাথা গরম হয়ে গেল টিভিতে জ্যোতিষ গণনা শুনতে শুনতে। মীঠঠী ফুলের গোছা হাতে দাদীর নাকের ডগার সামনে গিয়ে ঝাঁঝিয়ে বলে, “দাদি, টিভি বন্ধ কিজিয়ে!” বলতেই ফুঁসে উঠলেন দাদি। “কিউঁ?” 

“কিউঁ কি মেরি কান পক গিয়া হ্যয় য়েহ বকয়াস সুনকে!”

ব্যস, আর যায় কোথা! গরম ঘিয়ে পানি পড়লে যা হয়। “কী? যত বড় মুখ নয় বড় কথা? আমি বকয়াস শুনি? তুই কী ভাবিস নিজেকে? মেয়েলোকের এত ঘমণ্ড ভালো নয়! সারাদিন বাইরে তা থৈয়া করে ঘরে এসে আবার বড়ী বড়ী বাত করছিস?” 

অন্যদিন হলে মিঠঠী অনেক বুরা বাত হয়তো আনশুনি করে, নয়তো ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেয়। আজ যে কী হল, হয়তো সকাল থেকে রিখিয়ার কাছে বাড়ীর লোকদের ব্যাবহার নিয়ে নানা কথা আলোচনা করে মনটা ভারী হয়ে ছিল। মিঠঠী তড়পে উঠে বলল “কি আজব! পড়তে গেছিলাম তো!”   

দিবাকর হেঁকে বললেন, “বড়োঁকে সাথ এইসি বাত বোলতী হো? বেশী পড়াশোনা করলে মেয়েলোকের দিমাগ গরম হয়ে যায়, কাহাবতই আছে।” 

দাদি টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, “যা, বাহার নলসে মুহ হাত ধোকে আ। উলটা চোর কোতওয়াল কো ডাঁটে!” 

মিঠঠী চলেই যাচ্ছিল, দাদির কথায় ঘুরে দাঁড়ালো। “আপনে চোর কিসকো বোলা?” চাচি এগিয়ে এসে সামোসার প্লেট হাতে বলল, “গুসসা থুক দে মিঠঠী। লড়কী লোগ কা এইসা গুসসা ঠিক নেহি!”

“আপলোগ মুঝে এক মিনিটকে লিয়ে লড়কী নেহি, স্রিফ ইনসান সোচ সকতে হ্যাঁয়?” ঘরের সবাই মিঠঠীর কথায় ঘুরে তাকাল। “হামেশা য়েহ লড়কীওয়ালা এডভারটীসমেণ্ট বন্ধ কীজিয়ে!” বলে দাদির দিকে তাকায় মিঠঠী। 

“মৈনে ক্যা কিয়া?” দাদী অবাক। 

“তুমি রোজ এক কথা বলো বেরোবার সময়। ‘মীঠঠী, গণেশজীকো মাথা ঠোককে জানা।’ আর আজ কী বললে? বেরবার সময় সারা পাড়া শুনিয়ে বল্লে, ‘মীঠঠী, আজ ভুল কর ভি গণেশজীকো ছুনা নেহি!’ তারপর আধি রাস্তা চলে গেছি, শুনলাম দাদি চেঁচাচ্ছে  ‘জ্যাদা উছলকুদ মত করিয়ো!’ সারা মহল্লাকে আমার সিচুয়েশন না জানালে চলে না তোমার?” 

বুআ বলল, “ওম্মা, তাতে কী?” 

“তাতে কী মানে? আমার একটা রেস্পেক্ট আছে তো না কি? স্পষ্ট দেখলাম বিট্টূটা হাসল! শুধু তাই না, কক্কড় আণ্টি সবজী নিচ্ছিল, সব্জিওলা পর্যন্ত জেনে গেল! এক কাজ কর বরং তোমরা, কাল থেকে একটা চোঙ্গা নিয়ে কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে জানিয়ে দিও গোটা মহল্লায় যে আই অ্যাম অন মাই পিরিয়ডস!”  

গোটা ঘরে যেন কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ল। ফুফা বিষম খেল। চাচা জ্যোতিষ গণনার বিচার চরম আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগল।  আম্মা, চাচির মাথা ঝুঁকে গেল। দাদির চোখ দুটো দশটাকা দামের গুলাব জামুন হয়ে রইল। দিবাকরের মুখে আচমকা কথা সরলো না! 

শেষমেশ দাদিই বিলাপ রাগিণীতে আলাপ শুরু করল। “হায়, হায়, এ কি মুখের ভাষা! কি অপবিত্র বাতাবরণ!” 

মিঠঠী অবাক হয়ে বলল, “কী রে বাবা! পিরিয়ডকে পিরিয়ড বলতে পারব না?” 

আম্মা দু কান চেপে ধরে বলল, “চুপ হো যা, চুপ হো যা!” 

চাচি শান্ত সুরে বললে, “মিঠঠী, এইসি অপবিত্র ভাষা মত বোলো বেটা!”

“জী হাঁ, আপলোগ মহান পবিত্র হো, ম্যয় ঠয়রি অপবিত্র! খানে কা প্লেট অলগ, বরতন অলগ, উপরসে অপনা বরতন ভি খুদ ধোও, বাহর কি ট্যাঙ্কীসে নাহাও, জামিনপে সোও। নৌকর ঔর মুঝমে কোই ডিফারেন্স নেহি হ্যয়। ঔর ম্যায় করনা ভি নেহি চাহতি। পর য়হ্যাঁ তো হো রহা হ্যয় না? হোয়াই? বিকস আই অ্যাম অন মাই পিরিয়ডস!” 

দাদি এবার বুক চেপে চেয়ারে এলিয়ে পড়ল। সবাই ‘এই পানি আন, ফ্যান জোরে কর, কুলার চালা’ বলে হৈচৈ লাগিয়ে দিল। ফুফা মিঠঠীকে ছোটো থেকে দেখেছেন, এই রগচটা কিন্তু ব্রিলিয়াণ্ট মেয়েটাকে মনে মনে স্নেহ করেন। কেস বেগতিক দেখে বললেন,  “মিঠঠী বেটা তু উপর চলা যা, ফ্রেশ হোকে আ।” 

কিন্তু সে গুড়ে বালি। মিঠঠীর দাদি চেয়ার ফুঁড়ে ঘাড় বেঁকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “দিবাকরের কথা মেনে ওর জলদি শাদি করান দরকার ছিল। তাহলে আজ আর এই দিন দেখতে হত না।”

মিঠঠী সহানুভূতির আশায় এদিক সেদিক তাকাল। সেই থেকে রাহুল আর মেহুল খচর মচর চিপস চিবিয়েই চলেছে। ঘরে যে এতবড় একটা ঝামেলার মেঘ দানা পাকিয়ে উঠেছে, সেদিকে তাদের কোনও খেয়াল নেই। মিঠঠী ওদের সামনে গিয়ে কোমরে হাত রেখে দাঁড়াল। 

“হোয়াট?” রাহুল তাকাল মিঠঠীর দিকে। 

“ক্যান ইউ শাট আপ?” মিঠঠীর গনগনে মুখ। 

“বাট আই ডিডণ্ট সে এনিথিং!” রাহুল মরিয়া।

মিঠঠী কোনও দয়া না করে বলল, “বাট ইউ আর ব্রিদিং সো লাউডলি! জাস্ট স্টপ ব্রিদিং!”  

দাদি  মাঝে পড়ে বেসুরে কেঁদে উঠল। “ওরে আমি আর বন্নো তখন গিল্লি ডাণ্ডা খেলছিলুম রে, আর আমাদের দাদি দোরের কাছে খাটিয়ায় বসে বসে উল বুনছিল। হঠাৎ কী হল, আমার দাদি ‘সত্তানাশ হো গিয়া’ বলে ঘর থেকে গঙ্গাপানির ঘড়া এনে তার থেকে চাদ্দিকে ছেঁটোতে ছেঁটোতে বোলতে লাগল,  ‘হে ঠাকুরজী মাফ করনা, সব পাপ সাফ কর দিজিয়ে’ বলে হিড়হিড় করে আমাকে বাড়ীর পিছওয়াড়ে মে লে যাকে এক কাল কোঠরি মে বন্ধ কর দিয়া। ডরকে মারে ম্যয় রোনে লগি। ঘর তো নয়, একটা ছোট গুহা যেন! ফাটা মাটির মেঝে, দরমার দেওয়াল, খড়ের চাল। শুকনো কটা ঘাস বিচালি পড়ে আছে। এক কোনে ভাঙ্গা মাটির উনান। খানিক পরে মা এসে কতগুলো কাপড় হাতে ধরিয়ে দিয়ে বল্লে আমাকে ওই অন্ধ ঘরে পাঞ্চ ছে দিন থাকতে হবে। আমি ভেবেছিলুম আমার কোনও ভারি ব্যারাম হয়েছে, আমি বুঝি মারা পড়ব। খুব কাঁদছিলাম। মা শুখা রোটি আর সব্জি দিয়ে বলে গেল কাল থেকে ওই উনানে নিজেকেই রাঁধতে হবে। সূর্যের আলোয় দিনে বেরন যাবে না। রাত ভোরে উঠে আঙিনার কুয়ায় নাহাতে হবে। কারও সঙ্গে কথা গাল গল্প চলবে না। ইশকুল, খেলা সব বন্ধ। ওরে, আমি তখন মাত্র ন’ কি দস! সারারাত ওই খেপলার দরজা আটকে বসে বসে কাঁপি। রাতের পৃথিবীতে কত রকম অজানা অচেনা ডাক! কারা যেন মাঝে মধ্যে দরজা ধাক্কাত। মা বলে দিয়েছিল ‘কুছ ভি হো যায়ে দরওয়াজা নেহি খোলনা।’ শুকনো ঘাসের আঁটিতে শোয়া, ঘুম কি আসে? ভয়ে মরি। কাঁদব যে, দেখবে কে? মা’র কাছে লোটা ভরা দুধ চেয়েও পাইনি। দাদি বলেছে ‘তেরি ছুনেসে গায় ভঁইস সব মর জায়েগী।’ গাঁওএর পঞ্চরা বিধান দিত এই সময় ঔরতরা হয় অশুচি। মন্দিরের পণ্ডিত মাহারাজজী বলতেন বাড়ীতে ছোঁয়াছুঁয়ির মাঝে থাকলে গৃহস্থের অকল্যাণ। ফসল ভালো হবে না। ঘরের বাস্তুদেওতা অসন্তুষ্ট হবেন সুখ শান্তি সব নষ্ট হবে। ওরে, আমি যে চিরকাল এসব দেখকে শুনকে বড়ো হয়েছি। এসব কি মিথ্যে বোলতে চাস তুই!”  

দাদির পুরো কেস হিস্ট্রি জেনে মিঠঠী তো থ! কিছুক্ষণ পর সে বললে, “আচ্ছা দাদি, তুমি কি সত্যিই বোকা? না বোকা হবার ভান করছ?” 

দাদির দুঃখভরা কাহানী শুনে ঘরের সবারই মন ভারী হয়েছিল বৈ কি! বুআ তাই সবার হয়ে মিঠঠীকে কঠোর গলায় বলল, “মিঠঠী, দু পাতা ইংরিজি কি পড়েছিস, ধরাকে সরা ভাবছিস! আরে, আমরাও এসবের ভেতর দিয়ে বড়ো হয়েছি। ন্যাপকিন কিনতে বেরলে আম্মা তো বলতই,  ‘কালা পলিথিনমে লপেটকে লানা।’ আর পাড়ার দুকানদার চাচাও হামেশা খবরের কাগজে মুড়ে তারপর কালা পলিথিন পেঁচিয়ে তবেই দিত।” 

শুনে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মিঠঠী বলল, “কিউঁ? আপ নিউক্লিয়ার বম্ব লে কে আ রহী থি ক্যা? রাস্তায় কারও চোখে পড়লে হাল্লা মচ জায়েগা? এটা কি এমন গোপন জিনিষ যে, ছুপাকে লে কে লানা পড়েগা? কোনও মাদক নয়,  ইল্লিগাল,বন্দুক গুলি নয়, দারু ওয়ারুও নয়, তো?” 

বুআ রেগে বলে, “আরি, শরম হায়া নাম কী কোই চীজ হোতা ভি হ্যয় কি নেহি? লোগ ক্যা বোলেঙ্গে?”    

“আজ্ঞে না! শরম হায়া কী কোই বাত হ্যয় হি নেহি!” মিঠঠী উত্তেজিত হয়ে বলে, “তোমাদের কাছে লোগ মানে তো পুরুষ! তোমরা পুরুষদের চালাকিটা এখানে ধরতে পারলে না? আরে বাবা, সরি দাদি, আবার ভিরমি খেও না, আমাদের পিরিয়ডস হয় পিটিউটারি গ্ল্যাণ্ডের হেডমাস্টারিতে কয়েকটা হরমোনের সিক্রিশনের জন্য। একটু যদি বুদ্ধির ব থাকত আর গুগুল থাকত সে যুগে, তাহলে এসব কনফিউশান হত না। ভগবানজীর বয়ে গেছে বেওকুফের মত গুসসা করতে, কারণ পুরো ব্যাপারটাই ন্যাচারাল, পিওর সায়েন্স ছাড়া আর কিছুই নয়। মহিলাদের অপবিত্র বলে নীচা দেখাবার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু না এগুলো।” 

দাদি খানিক রয়ে রয়ে শুনল, তারপর ছাতি পকড়কে “উইম্মা! ম্যয় মর গয়ি” বলে বুক চিপে চক্ষু মুদে চিৎপাত। গেল! গেল! রব উঠল। দিবাকর বাঘের মত লাফিয়ে মা’র কাছে এসে “আম্মা! আম্মা!” বলে ঝাঁকাতে লাগলেন। চাচা চেঁচাতে চেঁচাতে হাঁকল, “পানি! পানি!” ফুফা ফোনবুকের পাতা পাগলের মত হাঁটকাতে হাঁটকাতে “ডক্টর ডক্টর” আওড়াতে লাগল। সুধা আর চাচি মিলে চোখে আঁচল চাপা দিয়েছে কি দেয়নি, রাহুল মেহুল মিঠঠীকে এক হাত নিয়ে তড়পে বলল, “ভেবলূর মতন দাঁড়িয়ে আছিস কি রে? মানুষ না ঘোড়ার ডাক্তার তুই?”  

সেই শুনে সবাই সম্বিত ফিরে পেল। আরে তাই তো! জলজ্যান্ত ডাক্তার তো সামনেই দাঁড়িয়ে! দিবাকর বললেন, “তাড়াতাড়ি বার করো কী যন্ত্রপাতি আছে তোমার! দেখছ সুধা, আমি বলেছি না, টাইম ইজ মানি, এ কথাটা কোনও দিন আর বোঝানই গেল না তোমার লাডলিকে!”

চাচা মিঠঠীকে এক ধাক্কা মেরে বললেন, “আরি ও, সঙের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস বল তো?” 

ফুফা আবার কেস হিস্ট্রি পেঁচিদা দেখে মিঠঠীর কানের কাছে এসে বললেন, “কোই বাত নেহি, অগর তু কনফিডেণ্ট নেহি হ্যয় তো গলি মেঁ জো চোপড়া বৈঠতে হ্যাঁয় ঊনকো বুলা লেতে হ্যাঁয়!” 

দাদির নট নড়ন চড়ন হাল এবার লম্বি লম্বি সাঁসে দাঁড়াল। মিঠঠী তবু ঢেঁটার মত দাঁড়িয়ে দেখে সুধার মত শান্ত মানুষও গেল ক্ষেপে। বুআ কোঁকিয়ে কোঁকিয়ে সেই থেকে “আম্মা, আঁখে খোলো, আঁখে খোলো” করছেন। চাচি গেছেন পূজাঘরে মথা ঠেকতে।   “হোপলেস!” বলে দিবাকর ভীষণ রেগে পায়চারি আরম্ভ করলেন। ফুফা ফোন ধরে ওদিকে লাইন পাবার চেষ্টায় ‘হ্যালো হ্যালো’  করছেন। সুধা এসে বিষম বেগে এক খানা চড় মেয়ের ফোলা গালে কষাতেই যাচ্ছিলেন কি শাশুড়ি বলে উঠলেন, “খবরদার! ডক্টরনীর গায়ে হাত মত লগানা!” 

মিঠঠী চোখ পিটপিট করে দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখা! ইসলিয়ে ম্যায় চুপ থী! মেরে ছুঁনেসে দাদি শক মেঁ চল বসেঙ্গে!”  

বুক ধড়ফড়িয়ে ভিরমি খাচ্ছে তবুও এখনও ছোঁয়াছুঁয়ির বিচার! এবার মিঠঠীকে অবাক করে দু হাত বাড়িয়ে দাদি কাছে ডেকে বলল, “মরনা হ্যয় তো তেরে হাত কা দাবাই খাকে মরেঙ্গে, আউর জিনা হ্যয় তো তেরি তন কো সিনে সে লগাকে জিয়েঙ্গে।” 

নিজের কানকে বিশ্বাস হল না, যা শুনল মিঠঠী। দাদির মাথাটা ঠিক আছে তো?  দাদির দিকে গুটিগুটি এগিয়ে মিঠঠী এবার ব্যাগপ্যাক খুলে স্টেথোস্কোপটা বার করে। এক লমহে সবাই তটস্থ! তারপর দাদি দু হাত বাড়িয়ে নাতনিকে কাছে টেনে নেয়। বলে, “আজ তুই আমার চোখের বেয়াড়া পর্দাটা বিনা ছুরি কঁয়েচি চালাকে ঠিক কর দিয়া। আমি নতুন করে সব দেখতে পাচ্ছি! তুনে মেরি আঁখে খোল দী!” তারপর চোখ মটকে দাদি বলে, “আমার কিছুই হয়নি তা তুই ভালোই বুঝেছিলি তাই না? তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার নৌটঙ্কি দেখছিলি!” 

দরাজ হেসে মিঠঠী বলল, “নয়তো কি! হার্ট এটাক বোঝাতে গেলে ছাতির বাঁ দিক চেপে হ্যা হ্যা করতে হয় দাদি!” ঘর ফাটিয়ে হেসে ওঠে সবাই। লাজুক চোখে মীঠঠী দেখে আজ সব থেকে বেশী হাসছে পাপা। গর্বের হাসি।

Facebook Comments


এই রকম নতুন গল্পের খবর ই-মেলে পেতে সাইন-আপ করুন এখনই!

Leave a Comment: